সর্বশেষ
প্রচ্ছদে ফিরুন

বাংলাদেশে ইনফ্লেশন কমানোর উপায় কি?

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে বৈশ্বিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও ডলার সংকট, অন্যদিকে দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ক্রমাগত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়েছে, যা কেবল আর্থিক সংকট নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

অর্থনীতি|৫ মার্চ, ২০২৬, ০০:১১|পড়ার সময়: ৬ মিনিট|Adeeba Zunaira
বাংলাদেশে ইনফ্লেশন কমানোর উপায় কি? | পূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন

বাংলাদেশের সাধারণ ভোক্তাদের জন্য গত দুই বছর ধরে কোনো সুখবর নেই। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের পরিধি সেই গতিতে বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে দেশে মাসিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ [1]। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির হার, যা ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে [1]। এর অর্থ হলো, দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের প্লেটে খাবার কমছে, পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশন কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি জনজীবনের একটি বাস্তব যন্ত্রণা। যখন মুদ্রার মূল্য কমে যায়, তখন ভোক্তাকে একই পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকটের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। এই নিবন্ধে আমরা মুদ্রাস্ফীতির কারণগুলো চিহ্নিত করব এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ইনফ্লেশন কমানোর উপায়গুলো বিশ্লেষণ করব।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ও দেশীয় উপাদান

মুদ্রাস্ফীতির এই বর্তমান জোয়ার বাংলাদেশের একার সৃষ্টি নয়, তবে দেশীয় দুর্বলতা একে প্রকোপ করেছে।

বৈশ্বিক উপাদান

কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি ধীরগতিতে স্বাভাবিক হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে, যা খাদ্যপণ্য আমদানিকারক দেশ বাংলাদেশের জন্য আঘাত হয়ে দেখা দেয় [2]। এছাড়া বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যা পণ্যের চূড়ান্ত দামে প্রতিফলিত হয়েছে।

দেশীয় উপাদান

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রভাবের চেয়ে দেশীয় কারণগুলোই অধিক নিয়ন্ত্রক। দেশটির আমদানি নির্ভরতা অত্যধিক; জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, ডাল, আটা এবং শিল্পের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ২০২২ সালের শুরুতে যেখানে ১ ডলারের বিপরীতে ৮৫-৮৭ টাকা পাওয়া যেত, সেখানে ২০২৪ সালের মধ্যে তা ১১০ থেকে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে [3]। এই অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। একে অর্থনীতিতে 'কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন' বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা ও মুদ্রানীতি

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি সংকোচন করে, অর্থাৎ সুদের হার বাড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নীতি সুদের হার (Policy Rate) ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করেছে [4]। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং খাতে সুদের হার বাড়িয়ে ঋণের চাহিদা কমানো, যাতে বাজারে অতিরিক্ত টাকার প্রবাহ কমে আসে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত। কারণ, বাংলাদেশে ঋণের একটি বড় অংশ সরকারি খাত এবং বড় বড় শিল্প গ্রুপ নিয়ে যায়, যারা সুদের হার বাড়লেও ঋণ নিতে বাধ্য থাকে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের অভাবে ব্যাংকগুলো এলসি (LC) খুলতে না পারায় আমদানি সংকুচিত হয়েছে, যা বিপরীতভাবে পণ্যের সরবরাহ সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের 'ক্রলিং পেগ' বা নমনীয় বিনিময় হার নীতি দীর্ঘকাল স্থগিত রাখা এবং পরবর্তীতে হঠাৎ টাকার মূল্য কমিয়ে আনা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে [5]

ওএমএস, ভর্তুকি ও বাজার মনিটরিং

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস)

সরকার ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ওএমএস-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সস্তায় চাল, ডাল ও তেল বিক্রি করছে। টিসিবির ওএমএস কার্যক্রমে বর্তমানে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করা হচ্ছে, যা বাজার দরের প্রায় অর্ধেক [6]। এটি নির্দিষ্ট সংখ্যক সুবিধাভোগীর জন্য সান্ত্বনা হলেও, বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এর প্রবেশাধিকার সীমিত। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে ওএমএসের সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাজার মনিটরিং

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বাজার মনিটরিং বা অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। অকারণ দাম বাড়ানোর অভিযোগে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়, কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সিন্ডিকেটিং বা কার্টেল গঠনের কারণে দাম নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হচ্ছে। কৃষক যখন ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, অন্যদিকে ভোক্তা কিনছে দ্বিগুণ দামে—এই ব্যবধানটি দূর করতে পারেনি প্রশাসনিক তদারকি।

ভর্তুকি ও ইন্ধন দাম

সরকার জ্বালানি খাতে বিশাল ভর্তুকি প্রদান করলেও, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে জ্বালানি দাম বাড়িয়েছে। এটি মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারলেও, তা জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় শিকার নিম্ন আয়ের মানুষ এবং স্থির আয়ের পেশাজীবীরা। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতির কারণে গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে [7]। মজুরি বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব আয় (Real Wage) হ্রাস পেয়েছে।

খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি বেশি হওয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে খরচ করছে, ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এটি মানব মূলধন গঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর। অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি সঞ্চয় কমে যাওয়া এবং ঋণের বোঝা বাড়ার কারণে মানসিকভাবেও চাপের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা উদ্বিগ্ন যে, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে দারিদ্র্যের হার বাড়বে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ ভারত ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। ভারতে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশাল খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা (Public Distribution System) শক্তিশালী করেছে এবং রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশীয় বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে [8]। ভিয়েতনাম বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে কৃষি পণ্যে আত্মপোষক হয়ে উঠেছে, যার ফলে বৈশ্বিক শক্তি সংকটেও তাদের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি।

বাংলাদেশকে কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা বাড়িয়ে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। সরকারি বিনিময় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

বাংলাদেশে ইনফ্লেশন কমানোর উপায়

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একদিনে সম্ভব নয়, এজন্য সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শক্রমে বাংলাদেশে ইনফ্লেশন কমানোর উপায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা

ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য স্থিতিশীল না হলে আমদানি ব্যয় কমানো যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বচ্ছ ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ করতে হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনতে প্রণোদনা আরও সহজ করতে হবে।

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো

খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো অপরিহার্য। বীজ, সার ও কৃষি যন্ত্রের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আবাদি জমি অন্য কাজে ব্যবহার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম ও ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পায় এবং পণ্য নষ্ট না হয়।

আমদানি বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি বাড়ানো

সব পণ্য একটি দেশ থেকে আমদানি করার ফলে সাপ্লাই চেইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশকে ভারত, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি, রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জোরদার করতে হবে।

শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থাপনা

বাজারে অনিয়ম ও সিন্ডিকেট প্রতিরোধে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জনবল ও ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে হবে। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস এবং কৃষক-ভোক্তা সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলে মধ্যস্বত্বভোগীরা কমে যাবে।

আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব সংস্কার

সরকারের রাজস্ব আদার পরিধি বাড়াতে হবে। রাজস্ব বাড়লে সরকার কম ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে পারবে, যা মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। একই সাথে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলো দক্ষভাবে মুদ্রা বিতরণ করতে পারে।


ইনফ্লেশন কমানোর উপায় হিসেবে সুদের হার বাড়ানো বা বাজারে অভিযান চালানো—এগুলো কেবল প্রলেপ মাত্র। মূল সমাধান নিহিত রয়েছে উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মধ্যে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বার্থপরতা ত্যাগ করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে অর্থনীতির সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা মুদ্রাস্ফীতির এই নীরব জোয়ার বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথ মন্থর করে দেবে এবং সমাজে বিভেদের সৃষ্টি করবে।

সূত্র

  1. .
    Consumer Price Index (CPI) Report March 2024Bangladesh Bureau of Statistics
  2. .
    State of the Bangladesh Economy Report 2024Centre for Policy Dialogue (CPD)
  3. .
    OMS Price List and Operations Update 2024Trading Corporation of Bangladesh (TCB)

আরও পড়ুন