সর্বশেষ
প্রচ্ছদে ফিরুন

ইউনেস্কো ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকায় বাংলাদেশ

অনেকেই ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি এবং ইউনেস্কোর ঐতিহ্য তালিকার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না। জিআই ট্যাগ একটি পণ্যের বাণিজ্যিক অধিকার রক্ষা করে, কিন্তু ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সেই পণ্যের পেছনের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও শিল্পকলাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য|২ মার্চ, ২০২৬, ১৬:৪৫|পড়ার সময়: ৬ মিনিট|Zarrar Hyder
ইউনেস্কো ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকায় বাংলাদেশ

বিশ্বায়নের এই যুগে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ করা প্রতিটি জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনেস্কোর (UNESCO) "অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য" (Intangible Cultural Heritage - ICH) তালিকা একটি দেশের ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মাধ্যম। ২০০৩ সালের কনভেনশনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিল্প 'টাঙ্গাইল শাড়ি' এবং 'রিকশা চিত্রাঙ্কন' নিয়ে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারিত হয়েছে, তা বাস্তব অবস্থান থেকে মিল খুঁজে পায় না। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ইউনেস্কো স্বীকৃত উপাদান, টাঙ্গাইল শাড়ির প্রকৃত অবস্থান এবং সরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশ ইউনেস্কোর ২০০৩ সালের কনভেনশনের সদস্য হিসেবে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদানগুলো বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ৫টি উপাদান ইউনেস্কোর "প্রতিনিধিত্বকারী তালিকায়" (Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity) স্থান পেয়েছে। সাম্প্রতিককালে অনেক সূত্রে ৪টি উপাদানের কথা বলা হলেও, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নতুন একটি উপাদান যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যাটি ৫-এ দাঁড়িয়েছে।

বাউল গান (২০০৮)

বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ও লোকসংগীতের অন্যতম ধারা বাউল গান। ২০০৮ সালে এটি ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বাউল গান শুধু সংগীত নয়, এটি একটি জীবনদর্শন যা মানবতাবাদ, ভালোবাসা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। লালন শাহ, পঞ্চন শাহ, শাহ আবদুল করিমের মতো বাউল সাধকদের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।

জামদানি বুনন (২০১৩)

বাংলাদেশের বুনন শিল্পের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো জামদানি। ২০১৩ সালে ঐতিহ্যবাহী জামদানি বুনন শিল্প ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে। এটি বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে কোনো কাগজের নকশা ছাড়াই তাঁতিরা মনের মাধুরী মিশিয়ে বুনে তোলেন অপূর্ব নকশা। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের হস্তশিল্পকে বিশ্ববাজারে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গল শোভাযাত্রা (২০১৬)

বাংলা নববর্ষের উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত এই শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পায়। এটি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। যেকোনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সুখ ও শান্তির প্রত্যয়ে মানুষের এই মিছিল বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।

শিল্পত পাটি বুনন (২০১৭)

সিলেট অঞ্চলের দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শিল্পত গ্রামের বেত ও বাঁশের তৈরি মাদুর বা 'শিল্পত পাটি' ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়। এই পাটি বুনন শিল্প শুধু ব্যবহারিক উপযোগিতাই নয়, এর শিল্পগুণ এবং পরিবেশ-বান্ধব বৈশিষ্ট্যের জন্যও বিখ্যাত। এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনধারার এক অনন্য নিদর্শন।

রিকশা ও রিকশা চিত্রাঙ্কন (২০২৩)

বাংলাদেশের সর্বশেষ সংযোজন হলো 'রিকশা ও রিকশা চিত্রাঙ্কন'। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বতসোয়ানায় অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ১৮তম অধিবেশনে এটি তালিকাভুক্ত হয়। ঢাকার রিকশা এখন কেবল যানবাহন নয়, এটি বাংলাদেশের চলমান লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রিকশার গায়ে আঁকা ফুল, লতাপাতা, চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা এবং গ্রাম বাংলার দৃশ্যগুলো বাংলাদেশি শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের নিদর্শন। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের নগর সংস্কৃতিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ করেছে।

টাঙ্গাইল শাড়ি ইউনেস্কো তালিকায় নেই, তবে কেন এমন প্রচার?

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে যে, "টাঙ্গাইল শাড়ি ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পেয়েছে"। বাস্তবে, ইউনেস্কোর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা নথিপত্রে এখনো টাঙ্গাইল শাড়িকে আন্তর্জাতিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এই বিভ্রান্তির পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে, যা সঠিকভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।

ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি

সাম্প্রতিককালে টাঙ্গাইল শাড়ি একটি বিরাট স্বীকৃতি পেয়েছে, তা হলো—ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication - GI) ট্যাগ। এটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির অধীনে বুদ্ধিসম্পদ অধিকারের অংশ। বাংলাদেশের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে জিআই স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এটি নিশ্চিত করে যে, টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি ও ঐতিহ্য বাংলাদেশে। এই বাণিজ্যিক স্বীকৃতিটিই অনেক সময় ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি হিসেবে ভুলভাবে প্রচারিত হয়।

জাতীয় ইনভেন্টরিতে অন্তর্ভুক্তি

ইউনেস্কোর ২০০৩ সালের কনভেনশনের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের দেশের অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি তালিকা বা 'ইনভেন্টরি' তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে "জাতীয় ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ ইনভেন্টরি" তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ৩১৮টি উপাদান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির বুনন শিল্প এই জাতীয় তালিকায় রয়েছে। ইউনেস্কোর নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক তালিকায় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য জাতীয় ইনভেন্টরিতে থাকা বাধ্যতামূলক। সুতরাং, টাঙ্গাইল শাড়ি এখন প্রার্থী তালিকায় (Pipeline) রয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নয়।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় ইনভেন্টরিতে স্থান পাওয়া ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে প্রথম ধাপ মাত্র; চূড়ান্ত স্বীকৃতির জন্য তাঁতি সম্প্রদায়ের সম্মতি ও সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।

টাঙ্গাইল শাড়ি ইউনেস্কোর তালিকায় আসবে কখন?

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে টাঙ্গাইল শাড়িকে ইউনেস্কোর প্রতিনিধিত্বকারী তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ডসিয়ার বা মনোনয়নপত্র প্রস্তুত করছে। ইউনেস্কোর মনোনয়ন প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। প্রতি বছর ৩১ মার্চের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয় এবং এক বছর পর মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে টাঙ্গাইল শাড়ি ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পাবে। তবে এজন্য তাঁতি সম্প্রদায়ের সাথে বিস্তারিত আলোচনা এবং তাদের সম্মতিকে গুরুত্বের সাথে নথিবদ্ধ করতে হবে, যা ইউনেস্কোর প্রধান শর্ত।

বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পিরিয়ডিক রিপোর্ট

  • ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তাদের প্রতিশ্রুতি পালনে নিয়মিত। সরকার প্রতি ছয় বছর পর পর পিরিয়ডিক রিপোর্ট (Periodic Report) জমা দিয়ে আসছে। এই প্রতিবেদনে ঐতিহ্য সংরক্ষণের আইনি, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপগুলো তুলে ধরা হয়।

  • আইনি কাঠামো: বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। 'বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আইন, ২০১৯' এবং 'জাতীয় সংস্কৃতি নীতি' এই ঐতিহ্য রক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করেছে।

  • প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা: বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং জাতীয় জাদুঘর ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রধান প্রতিষ্ঠান। এছাড়া "ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ সংরক্ষণ জাতীয় কমিটি" নীতি নির্ধারণের কাজ করছে।

  • শিক্ষা ও সচেতনতা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইতে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও ঐতিহ্যের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে তাদের ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ৫টি স্বীকৃত উপাদান ছাড়াও টাঙ্গাইল শাড়ি, ঢাকাই মসলিন এবং লোকগানের মতো অসংখ্য ঐতিহ্য এই তালিকায় যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রে জিআই স্বীকৃতি এবং জাতীয় ইনভেন্টরিতে অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক ধাপ, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথকে সহজ করেছে। সঠিক ডকুমেন্টেশন এবং সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামীতে আরও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে সক্ষম হবে—এটাই প্রত্যাশা।


সচরাচর জিজ্ঞাসা:

১. ইউনেস্কোর ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকায় বাংলাদেশের কতগুলো উপাদান রয়েছে?
উত্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের ৫টি উপাদান এই তালিকায় রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে রিকশা ও রিকশা চিত্রাঙ্কন এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

২. টাঙ্গাইল শাড়ি কি ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে?
উত্তর: না, টাঙ্গাইল শাড়ি এখনো ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক তালিকায় স্থান পায়নি। তবে এটি বাংলাদেশের জাতীয় ইনভেন্টরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এটি জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে।

৩. জিআই ট্যাগ আর ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: জিআই ট্যাগ (Geographical Indication) একটি বুদ্ধিসম্পদ অধিকার, যা নির্দেশ করে কোনো পণ্যের ভৌগোলিক উৎপত্তি কোথায়। অন্যদিকে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সেই সংস্কৃতির মানবতার জন্য গুরুত্ব নির্দেশ করে।

৪. বাংলাদেশের পরবর্তী কোন উপাদানগুলো ইউনেস্কোর তালিকায় আসতে পারে?
উত্তর: টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি ঢাকাই মসলিন, গাজীর গান এবং কুমিল্লার শাঁখারী বাড়ির ইতিহাস ইউনেস্কোর তালিকায় আসার জন্য সম্ভাবনাময়।

সূত্র

  1. .
    নিজস্ব প্রতিবেদনপূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন