RAISE প্রকল্পের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুবর্ণ সুযোগ
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পিকেএসএফ বাস্তবায়িত RAISE প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার যুবক ও কোভিড-ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ। এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, ঋণের নিয়ম এবং আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের (Informal Sector) ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারীর পর এই খাতের কর্মীরা এবং দেশের বিপুল সংখ্যক যুবক চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। এই সংকট মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) বাস্তবায়ন করছে যুগান্তকারী RAISE প্রকল্প। "Recovery and Advancement of Informal Sector Employment" বা সংক্ষেপে RAISE প্রকল্পটি বর্তমানে বাংলাদেশের যুব সমাজের জন্য এক বিরল সুযোগ।
RAISE প্রকল্প কী?
RAISE হলো বিশ্বব্যাংক এবং পিকেএসএফ-এর যৌথ উদ্যোগে একটি বিশাল কর্মসংস্থান প্রকল্প। এর মূল লক্ষ্য হলো শহর ও পারি-শহর এলাকার নিম্ন-আয়ের যুবকদের এবং কোভিড-১৯ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা।
প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য:
পূর্ণ নাম: Recovery and Advancement of Informal Sector Employment.
বাস্তবায়নকারী: পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)।
অর্থায়ন: বিশ্বব্যাংক (World Bank)।
মোট বাজেট: প্রায় ৬,১০০ কোটি টাকা ($৫৩৬.৫০ মিলিয়ন)।
সময়কাল: ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ পর্যন্ত।
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ১৫০.৭৫ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে, যা প্রমাণ করে এর সাফল্য এবং প্রয়োজনীয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
সহজ কথায়, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো "বেকারত্ব দূর করা এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা"।
কোভিড-ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন: মহামারীর কারণে যারা তাদের ছোট ব্যবসা বা কাজ হারিয়েছেন, তাদের পুনরায় কাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
যুব কর্মসংস্থান: নিম্ন-আয়ের পরিবারের যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কাজের ব্যবস্থা করা।
প্রবাসী কর্মীদের সহায়তা: দেশে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং তাদের দক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া।
RAISE প্রকল্পের মূল কার্যক্রম - ৩টি বিশেষ উপাদান
এই প্রকল্পে মূলত তিনটি পদ্ধতিতে কাজ করা হয়। আপনার জন্য কোন ক্যাটাগরিটি উপযুক্ত, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
শিক্ষানবিশ কর্মসূচি (Apprenticeship Program)
এটি RAISE প্রকল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। এখানে ঐতিহ্যবাহী "উস্তাদ-শাগরেদ" পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
পদ্ধতি: দক্ষ কারিগর বা মাস্টার ক্রাফটপারসন (MCP)-এর কাছে ৬ মাস হাতে-কলমে কাজ শেখা।
ট্রেডসমূহ: ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, ওয়েল্ডিং, অটো মেকানিক্স, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, সেলাই, বিউটি কেয়ার, প্লাম্বিং সহ ২৬টি ট্রেড।
সুবিধা:
প্রশিক্ষণ চলাকালীন মাসিক ভাতা বা স্টাইপেন্ড।
লাইফ স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান সহায়তা।
প্রায় ৮০% শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ শেষে ৩ মাসের মধ্যে চাকরি বা স্ব-কর্মসংস্থানে যুক্ত হন।
ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন (BMED)
যারা ইতিমধ্যে ছোট ব্যবসা করছেন বা নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য এই অংশ।
প্রশিক্ষণ: ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং লাইফ স্কিল বিষয়ে ৩ থেকে ১৬ দিনের প্রশিক্ষণ।
ঋণ সুবিধা: প্রশিক্ষণ শেষে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান। ইতিমধ্যে কোভিড-ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৮ কোটি টাকা এবং যুব উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রায় ৮.৫২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
প্রবাসী প্রত্যাগত কর্মীদের পুনরেকীকরণ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
প্রশিক্ষণ: দেশে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ, মনোসামাজিক পরামর্শ এবং ব্যবসা শুরু করার জন্য নগদ প্রণোদনা বা ঋণ সহায়তা।
ঋণ সুবিধা: ইতিমধ্যে ২,০০,০০০+ প্রবাসী কর্মী এই সেবা পেয়েছেন।
কারা এই প্রকল্পের উপকারভোগী হতে পারবেন?
প্রকল্পটি মূলত তিন শ্রেণির মানুষের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে:
কোভিড-১৯ ক্ষতিগ্রস্ত: যাদের ব্যবসা বা কর্মসংস্থান মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিম্ন-আয়ের যুবক: যারা বেকার এবং নতুন কিছু শিখে চাকরি বা ব্যবসা করতে চান।
প্রবাসী প্রত্যাগত: যারা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন এবং স্বাবলম্বী হতে চান।
(নোট: নারীদের জন্য ৫০% কোটা সংরক্ষিত থাকায় তারা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যবস্তু।)
উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও অর্জন (২০২২-২০২৫)
RAISE প্রকল্প ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতে একটি রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রশিক্ষণার্থী: ৭৩,০০০+ শিক্ষানবিশ এবং ৯০,০০০+ যুব উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
কর্মসংস্থান হার: প্রশিক্ষণ শেষে ৩ মাসের মধ্যে শিক্ষানবিশদের কর্মসংস্থানের হার ৮০% ছাড়িয়েছে।
সন্তুষ্টি: উপকারভোগীদের মধ্যে সন্তুষ্টির হার প্রায় ৯৮%।
বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ডিরেক্টর ইফফাত শরীফ বলেছেন, "PKSF বাংলাদেশে একটি অনন্য উন্নয়ন সংস্থা এবং RAISE প্রকল্প যুব কর্মসংস্থানের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল।"
প্রকল্পটি কেবল প্রশিক্ষণই দেয় না, নারীদের কর্মক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে টিকে থাকার জন্যও কাজ করে। বাড়িতে ভিত্তিক চাইল্ডকেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং অপ্রথাগত ট্রেডে (যেমন- ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং) নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এই প্রকল্পের অন্যতম সাফল্য।
কীভাবে RAISE প্রকল্পে আবেদন করবেন?
RAISE প্রকল্পে অংশ নিতে হলে আপনাকে পিকেএসএফ-এর অংশীদার সংস্থার (Partner Organization) সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
স্থানীয় অফিস: আপনার এলাকায় PKSF-এর অংশীদার সংস্থাগুলোর (যেমন: SDI, SUS, VERC, YPSA, HEED Bangladesh ইত্যাদি) শাখা অফিসে যান।
ওয়েবসাইট: PKSF অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
কভারেজ: বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৪০০+ উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে।
বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (Demographic Dividend) কাজে লাগাতে RAISE প্রকল্প একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প নয়, এটি একটি সামগ্রিক উন্নয়ন মডেল। যারা বেকার বসে আছেন বা ব্যবসায় সংকটে আছেন, তাদের জন্য এই প্রকল্পটি সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ১,৭৬,০০০ যুবক উপকৃত হবে। সুযোগটি হাতছাড়া না করে আজই আপনার নিকটস্থ অংশীদার সংস্থার সাথে যোগাযোগ করুন।
সূত্র
- ১.নিজস্ব প্রতিবেদন — পূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন
