২১শে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মপরিচয় ও বিশ্বজুড়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক । ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের মহান আত্মত্যাগ কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আনেনি, বরং এটি ছিল শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সফল বিদ্রোহ । ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর থেকে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে । ২০২৬ সালের থিম 'বহুভাষিক শিক্ষায় তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর' ডিজিটাল যুগে বিপন্ন ভাষা রক্ষা ও বৈশ্বিক উন্নয়নে এক নতুন প্রেরণা জোগাচ্ছে ।
একুশের অবিনাশী চেতনা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, মর্যাদা এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথ যে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তার প্রতিটি ফোঁটা ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বীজ । বাঙালি জাতি সেদিন শুধু তাদের মুখের ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য লড়েনি, বরং তারা লড়াই করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে । আজ একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের দরবারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত, যা পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষের নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সুরক্ষা ও সম্মান প্রদর্শনের সুযোগ করে দিয়েছে ।
সময়ের আবর্তে ১৯৫২ সালের সেই সংগ্রাম আজ একটি বিশ্বজনীন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এবং পরবর্তীকালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই দিবসের আনুষ্ঠানিক গ্রহণ একুশকে একটি বৈশ্বিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে । আধুনিক বিশ্বে যখন প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায় । ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই দিবসটি এখন তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাষা রক্ষার এক নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে ।
ভাষা আন্দোলনের উৎস ও প্রেক্ষাপট
বাঙালি জাতির এই সংগ্রামের শেকড় পোঁতা ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের অব্যবহিত পরেই। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের জন্য তা প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে আসেনি । বরং ভৌগোলিক দূরত্বের পাশাপাশি ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য শুরু থেকেই এই নবজাত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও তমদ্দুন মজলিস
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয় 。 এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পূর্ব বাংলায় সচেতন ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহল একাট্টা হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রথম সাংগঠনিক আন্দোলন শুরু করে ।
আন্দোলনের এই প্রাথমিক পর্বে এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক দাবি হিসেবে ছিল না, বরং এর সাথে মিশে ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকারের প্রশ্ন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক সকল ক্ষেত্রে উর্দুকে বাধ্যতামূলক করে বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা 。 এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভাষা আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি প্রদান করে ।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক প্রস্তাব ও ১৯৪৮-এর সংঘাত
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন 。 তিনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই ছিল বাংলাভাষী, অর্থাৎ জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ । তার দাবি ছিল, গণপরিষদের কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাতেও লেখা হোক।
কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের সংহতির পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এই অনমনীয় মনোভাবের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় । ১১ই মার্চের এই সফল ধর্মঘটে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন । পরবর্তীকালে খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সরকার তা বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করে ।
১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে পরিস্থিতি আবারও উত্তাল হয়ে ওঠে যখন খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ । এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে ২১শে ফেব্রুয়ারি হরতাল ও সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। সরকার তা দমনে ১৪৪ ধারা জারি করলেও ছাত্ররা তা অমান্য করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে ।
তারিখ ও বছর, ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, প্রধান ফলাফল
২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গণপরিষদ প্রস্তাব বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আনুষ্ঠানিক দাবি।
১১ মার্চ, ১৯৪৮, রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন ও ধর্মঘট ব্যাপক ধরপাকড় ও আন্দোলনের বিস্তৃতি।
২৭ জানুয়ারি, ১৯৫২, খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বের সূচনা।
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও পুলিশের গুলিবর্ষণ সালাম, রফিক, বরকত ও জব্বারের শাহাদাত।
২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২, শোক মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ শফিউর রহমানসহ আরও কয়েকজনের মৃত্যু।
সমাজ ও রাজনীতিতে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব
ভাষা আন্দোলন বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে আমূল পরিবর্তন সাধন করে। এটি ছিল বাঙালিদের মনের ‘উপনিবেশমুক্তি’র প্রথম সোপান । এই আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণিত হয় এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ধারার জন্ম হয় ।
আন্দোলনের প্রভাবে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে এবং যুক্তফ্রন্ট এক বিশাল জয় পায় । ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় শাসকগোষ্ঠী । এটি কেবল ভাষার বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, যা পরবর্তীকালে ১৯৬৬-র ছয় দফা এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয় ।
জাতীয় তাৎপর্য ও উদযাপন
স্বাধীন বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি দিবস নয়, এটি জাতীয় শোক ও গৌরবের সংমিশ্রণে এক অনন্য মহিমা লাভ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ১৯৭২ সাল থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা এর জাতীয় গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে ।
জাতীয় তাৎপর্য ও সাংবিধানিক সুরক্ষা
বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি হলো অশুভ শক্তির কাছে মাথানত না করার প্রতীক । রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই তেজ আজ সকল স্তরের মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে এই ভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ পাসের মাধ্যমে সকল সরকারি দপ্তরে বাংলা বাধ্যতামূলক করা হয় ।
বাৎসরিক উদযাপন ও প্রভাতফেরি
প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে পালিত হয় ‘শহীদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। উদযাপনের প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘প্রভাতফেরি’। ২০শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয় । এরপর সাধারণ মানুষ খালি পায়ে হেটে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি গেয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় । এই দিনটিতে কালো ব্যাজ ধারণ করা হয় এবং শোকের প্রতীক হিসেবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় ।
সাহিত্য, শিল্প ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা
একুশের চেতনা এ দেশের শিল্প-সাহিত্যে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস, মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক এবং আলতাফ মাহমুদের সুর করা গানগুলো একুশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।
একুশে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক প্রধান সাহিত্য ও শিল্পকর্ম:
মাধ্যম, নাম, রচয়িতা/সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, গুরুত্ব
উপন্যাস: আরেক ফাল্গুন, জহির রায়হান, ভাষা আন্দোলনের ওপর রচিত প্রথম উপন্যাস।
নাটক: কবর,মুনীর চৌধুরী, জেলখানায় বসে রচিত একুশের প্রথম নাটক।
কবিতা: কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি,মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম কবিতা।
সঙ্গীত: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, আবদুল গাফফার চৌধুরী (গীতিকার), আলতাফ মাহমুদ (সুরকার), একুশের কালজয়ী গান।
স্থাপনা: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শিল্পী হামিদুর রহমান, বাঙালির শোক ও শক্তির স্থাপত্য প্রতীক।
১৯৭২ সালে চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আজ বাংলাদেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এই মেলা আয়োজিত হয়, যা লেখক ও পাঠকদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত । ২০২৬ সালে পবিত্র রমজান ও নির্বাচনের কারণে মেলার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হলেও এর আবেদন কমেনি ।
ইউনেস্কো ঘোষণা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
২১শে ফেব্রুয়ারি আজ কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে পালিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস । এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর কূটনৈতিক ইতিহাস।
ইউনেস্কো ঘোষণা ও বাংলাদেশের উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মূল উদ্যোগটি এসেছিল কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত দুই প্রবাসী বাঙালি—রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের কাছ থেকে । তারা ১৯৯৮ সালের ৯ই জানুয়ারি তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন, যেখানে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব দেওয়া হয় ।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি ইউনেস্কোতে জমা দেওয়া হয় । ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সর্বসম্মতভাবে ঘোষণা করা হয় । এই ঐতিহাসিক জয়ে সৌদি আরবসহ ২৮টি দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়েছিল ।
বিশ্বব্যাপী উদযাপন ও বৈশ্বিক তাৎপর্য
২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। ইউনেস্কোর এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য ছিল ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা এবং বহুভাষাবাদের প্রসার । আজ ইউনেস্কোর সদর দপ্তর প্যারিসের পাশাপাশি লন্ডন, ওয়াশিংটন ডি.সি এবং টোকিওর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে শহীদ মিনারের আদলে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় । বিশেষ করে ভারতে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোতে এই দিবসটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করা হয় ।
একুশের কালজয়ী শিক্ষা
ভাষা আন্দোলনের চেতনা আধুনিক বিশ্বের সমঅধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষা করা প্রতিটি জাতির জন্মগত অধিকার।
ভাষা ও গণতন্ত্র
ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের লড়াই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি প্রমাণ করেছে যে, যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী একটি জাতির ভাষার ওপর আঘাত হানে, তখন তারা আসলে সেই জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বকেই মুছে দিতে চায় । ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ব বাংলায় সংসদীয় গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত মজবুত হয়েছিল, যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে ।
তরুণ প্রজন্ম ও একুশের সক্রিয়তা
১৯৫২ সালের আন্দোলনটি ছিল মূলত তরুণ ছাত্রসমাজের আন্দোলন । বর্তমান সময়েও একুশের চেতনা তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক অসংগতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের থিম— “বহুভাষিক শিক্ষায় তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর” (Youth voices on multilingual education) —তরুণদের এই ভূমিকারই এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি । প্রযুক্তির যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহার ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন আধুনিক প্রজন্মের হাতে ।
বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা ও বিপন্ন ভাষার চ্যালেঞ্জ
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮,৩২৪টি ভাষার মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে । একুশে ফেব্রুয়ারি আজ সেই বিপন্ন ভাষাভাষী মানুষদের জন্য আশার আলো। দিবসটি প্রতিবছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করা একটি মৌলিক মানবাধিকার । বর্তমান বিশ্বে বহুভাষিক শিক্ষা পদ্ধতি (MLE) বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে ।
শহীদ দিবসের বীরদের জীবনালেখ্য
ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগই একুশকে মহিমান্বিত করেছে। তাদের সংক্ষিপ্ত জীবন ও আত্মত্যাগের কাহিনী নিচে তুলে ধরা হলো:
শহীদের নাম, জন্ম ও জেলা, পেশাগত পরিচয়, শাহাদাতের বিবরণ:
রফিক উদ্দিন আহমেদ: ১৯২৬, মানিকগঞ্জ; বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে; ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ।
আবুল বরকত: ১৯২৭, মুর্শিদাবাদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র; ২১ ফেব্রুয়ারি পেটে গুলিবিদ্ধ হন এবং রাতে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ।
আবদুল জব্বার: ১৯১৯, ময়মনসিংহ; গ্রামীণ কর্মজীবী ও কৃষক; অসুস্থ শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে মিছিলে যোগ দেন এবং গুলিতে প্রাণ হারান ।
আবদুস সালাম: ১৯২৫, ফেনী; ডাইরেক্টরেট অফ কমার্স দপ্তরের পিয়ন; ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিতে মারাত্মক আহত হন এবং দেড় মাস পর ৭ এপ্রিল মারা যান ।
শফিউর রহমান: ১৯১৮, হুগলী; ঢাকা হাইকোর্টের হিসাব রক্ষণ শাখার কর্মচারী; ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে নবাবপুর রোডে সাইকেলে করে অফিসে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন ।
এছাড়াও ৯ বছর বয়সী অহিউল্লাহ এবং অজ্ঞাত অনেক বালক ও তরুণ এই আন্দোলনে রক্ত দিয়েছেন, যাদের ইতিহাস আজও গবেষণার বিষয় ।
একুশের চেতনা ও আগামীর অঙ্গীকার
২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জন্য একই সাথে শোক ও পরম গর্বের দিন। এটি আমাদের হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত এমন এক অগ্নিশিখা, যা আমাদের শিখিয়েছে কোনো অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করতে। বাঙালি জাতির এই মহান ত্যাগ আজ বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত হওয়ার অর্থ হলো— পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের তার নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার স্বীকৃত হওয়া ।
একুশের চেতনা কেবল একদিনের উদযাপনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের উচিত বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, নতুন প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া । ২০২৬ সালের এই রজতজয়ন্তী লগ্নে আমাদের শপথ হোক— পৃথিবীর প্রতিটি মাতৃভাষা বেঁচে থাকুক তার স্বীয় মহিমায় এবং ভাষার কারণে কোনো মানুষ যেন আর বৈষম্যের শিকার না হয়।
আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করি এবং সকল ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শিখি। এটিই হবে ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
একুশ মানে মাথা নত না করা।
সূত্র
- ১.নিজস্ব প্রতিবেদন — পূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন
