সর্বশেষ
প্রচ্ছদে ফিরুন

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনপদীয় বিবর্তনের একটি উচ্চতর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের আদি ইতিহাস, প্রাচীন জনপদ, সভ্যতা, এবং শাসনামল এর ওপর একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ।

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য|১৭ ফেব, ২০২৬, ০১:১৩|পড়ার সময়: ৯ মিনিট|Zarrar Hyder
প্রাচীন বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনপদীয় বিবর্তনের একটি উচ্চতর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই এর অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান এবং নদ-নদী কেন্দ্রিক ভূ-সংস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা - এই তিন প্রধান নদীর মিলনস্থলে গঠিত বিশ্বের বৃহত্তম এই বদ্বীপ অঞ্চলটি ছিল প্রাচীনকাল থেকেই মানব বসতির জন্য অত্যন্ত অনুকূল। হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি দ্বারা গঠিত এই উর্বর ভূখণ্ড কেবল কৃষির জন্যই নয়, বরং এর নদীপথগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে কাজ করেছে।

ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশের ভূমি বিন্যাসকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে প্লাইস্টোসিন যুগের সোপানসমূহ যেমন বরেন্দ্র ভূমি, মধুপুর গড় এবং লালমাই পাহাড় প্রাচীনতম জনবসতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে । প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও উৎখননের মাধ্যমে পাওয়া প্রস্তর যুগের হাতিয়ার এবং সরঞ্জামসমূহ প্রমাণ করে যে, অন্তত দশ হাজার বছর বা তারও আগে থেকে এই অঞ্চলে মানুষের পদচারণা ছিল। আদিম নিসাদ বা অস্ট্রাল-এশীয় নৃগোষ্ঠীর হাত ধরে এই অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, যারা পরবর্তীতে কোল, ভিল এবং সাঁওতাল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মানচিত্র

প্রাচীনকালে বাংলা কোনো একক রাজনৈতিক একক বা রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল না। বরং এটি ছোট ছোট অনেকগুলো অঞ্চলে বিভক্ত ছিল, যেগুলোকে সমষ্টিগতভাবে 'জনপদ' বলা হতো। এই জনপদগুলোর সীমানা ছিল অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং সময়ের সাথে সাথে এদের ভৌগোলিক পরিধি বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি জনপদ ছিল মূলত এক একটি সার্বভৌম বা আধা-সার্বভৌম রাজনৈতিক সত্তা, যার শাসনকর্তাগণ নিজেদের ইচ্ছামতো অঞ্চলগুলো পরিচালনা করতেন।

নিচে প্রাচীন বাংলার প্রধান জনপদগুলোর একটি তুলনামূলক সারণি উপস্থাপন করা হলো:

জনপদ প্রধান অঞ্চলসমূহ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

পুণ্ড্র (Pundra) বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর প্রাচীনতম জনপদ; রাজধানী পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) ছিল শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র।

বঙ্গ (Vanga) ঢাকা, ফরিদপুর, বিক্রমপুর, বরিশাল বাঙালি জাতির আদি উৎসভূমি; এটি বিক্রমপুর ও নাব্য—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।

সমতট (Samatata) কুমিল্লা ও নোয়াখালী (ট্রান্স-মেঘনা অঞ্চল) আর্দ্র নিম্নভূমি অঞ্চল; সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং একে একটি সমৃদ্ধ বৌদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেন।

বিজ্ঞাপন

হরিকেল (Harikela) সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলার পূর্বতম সীমান্ত এলাকা; আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ছিল।

গৌড় (Gauda) মুর্শিদাবাদ, মালদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শশাঙ্ক ও পাল রাজাদের প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র; এর সীমানা ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বরেন্দ্র (Varendra) উত্তরবঙ্গের বিশাল অংশ (পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত) পাল রাজাদের পিতৃভূমি হিসেবে পরিচিত; এখানে বরেন্দ্র বিদ্রোহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ।

চন্দ্রদ্বীপ (Chandradwip) বর্তমান বরিশাল জেলা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা দক্ষিণ বাংলার একটি ছোট কিন্তু প্রভাবশালী হিন্দু শাসিত রাজ্য ছিল।

এই জনপদগুলোর নামকরণ মূলত সেখানে বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীগুলোর নামানুসারে হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, পুণ্ড্র জাতি যেখানে বাস করত তার নাম পুণ্ড্র আর বঙ্গ জাতির এলাকাটি পরিচিত হয় বঙ্গ হিসেবে । তবে সমতট জনপদটির নাম ছিল বর্ণনামূলক, যা মূলত মেঘনা নদীর অববাহিকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করত ।

উয়ারী-বটেশ্বর

বাংলাদেশে নগরায়নের ইতিহাসকে আমূল বদলে দিয়েছে নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর আবিস্কার । ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পর পরিচালিত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রমাণিত হয়েছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের দিকেও এই অঞ্চলে একটি সুপরিকল্পিত এবং সুরক্ষিত দুর্গ নগরী বিদ্যমান ছিল। এটি ব্রহ্মপুত্র নদের পুরাতন গতিপথের ধারে অবস্থিত ছিল, যা একে তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলোর মধ্যে পাথরের পুঁতি, নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়্যার (NBPW), এবং রৌপ্য মুদ্রার ভাণ্ডার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । এখানকার beads বা পুঁতি শিল্প ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের এবং গবেষকদের মতে, এগুলোর সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমনকি রোমান সাম্রাজ্যেরও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল । মাটির নিচে আবিষ্কৃত একটি ইটের রাস্তা (road) এবং দুর্গ প্রাচীর বাংলার প্রাচীন প্রকৌশল বিদ্যার উৎকর্ষকে তুলে ধরে । উয়ারী-বটেশ্বর কেবল একটি শহর ছিল না, বরং এটি ছিল একটি শিল্প হাব যেখানে লোহা গলানো এবং মূল্যবান পাথরের কাজ করা হতো ।

মহাস্থানগড় ও পুণ্ড্রনগর

পুণ্ড্র জনপদের রাজধানী পুণ্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়) বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর কেন্দ্র। ১৯৩১ সালে আবিষ্কৃত ব্রাহ্মী শিলালিপি প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের সময় থেকেই এটি মৌর্য শাসনের অধীনে ছিল । করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই নগরটি ছিল রাজনীতি, ধর্ম এবং বাণিজ্যের মিলনস্থল।

মহাস্থানগড়ের খননকার্যে বিভিন্ন স্তরের সভ্যতা পাওয়া গেছে যা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা প্লাকগুলো প্রাচীন বাংলার সামাজিক জীবন, সাজসজ্জা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে 'গোবিন্দ ভিটা', 'বৈরাগীর ভিটা' এবং 'ভাসু বিহার' এর স্থাপত্যশৈলী তৎকালীন রাজকীয় এবং ধর্মীয় আভিজাত্যের পরিচয় দেয়।

বিজ্ঞাপন

গঙ্গাররিডাই

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকদের লেখায় 'গঙ্গাররিডাই' (Gangaridai) নামক এক দুর্ধর্ষ জাতি ও রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই রাজ্যটি বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। আলেকজান্ডার যখন ভারতবর্ষ জয় করতে আসেন, তখন এই গঙ্গাররিডাই বাহিনীর বিপুল ক্ষমতার কথা শুনেই তাঁর সৈন্যরা গঙ্গা পার হয়ে আক্রমণ করতে অস্বীকার করে।

গঙ্গাররিডাইদের শক্তির মূল উৎস ছিল তাদের ৬,০০০ যুদ্ধ হস্তীর এক বিশাল বাহিনী। টলেমি এবং অন্যান্য ভৌগোলিকদের মতে, তাদের রাজধানী ছিল 'গাঙ্গে' (Gange), যা অনেক গবেষক বর্তমানে চন্দ্রকেতুগড় বা উয়ারী-বটেশ্বরের সাথে তুলনা করেন। এই তথ্যগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাচীনকালেই এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত।

শশাঙ্ক ও প্রথম সার্বভৌম বাংলার উত্থান

সপ্তম শতকের শুরুতে বাংলার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয় রাজা শশাঙ্কের হাত ধরে। তাঁকে বাংলার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বাধীন রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি গৌড় জনপদকে কেন্দ্র করে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন । কর্ণসুবর্ণ ছিল তাঁর রাজধানী, যেখান থেকে তিনি মগধ ও ওড়িশা পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।

শশাঙ্কের রাজত্বকাল ছিল মূলত উত্তর ভারতের আধিপত্য রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি হর্ষবর্ধনের মতো শক্তিশালী সম্রাটকে মোকাবিলা করেছিলেন এবং বাংলার সীমানাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলেছিলেন। যদিও বৌদ্ধ ঐতিহাসিকগণ শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্মের নিপীড়ক হিসেবে চিত্রিত করেছেন, আধুনিক অনেক ঐতিহাসিক একে রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত বলে মনে করেন। তিনি ছিলেন একজননিষ্ঠ শিবভক্ত, যা তাঁর প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রায় শিবের প্রতিচ্ছবি থেকে প্রমাণিত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মের স্বর্ণযুগ ও সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ(পাল সাম্রাজ্য)

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় প্রায় একশত বছর ধরে যে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা চলেছিল, তাকে ইতিহাসে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়। এই অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে, যখন বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং সামন্তরা মিলে গোপাল নামক এক ব্যক্তিকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। এটি ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজবংশ স্থাপনের এক অনন্য ঐতিহাসিক নজির।

পাল রাজবংশ প্রায় ৪০০ বছর বাংলা ও বিহার শাসন করে, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসের দীর্ঘতম শাসনকাল। পাল রাজারা ছিলেন মূলত মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

নিচে পাল আমলের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রধান শাসকগণের একটি সারাংশ প্রদান করা হলো:

শাসক শাসনকাল প্রধান অর্জন ও অবদান

গোপাল (Gopala) ৭৫০ – ৭৭৩ খ্রি. পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা; মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন ।

ধর্মপাল (Dharmapala) ৭৭৩ – ৮১০ খ্রি. সাম্রাজ্য বিস্তার করে 'উত্তরপথস্বামী' উপাধি লাভ করেন; সোমপুর মহাবিহার ও বিক্রমশীলা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন ।

দেবপাল (Devapala) ৮১০ – ৮৫০ খ্রি. পাল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন ।

প্রথম মহিপাল (Mahipala I) ৯৮৮ – ১০৩৮ খ্রি.

পাল আমল ছিল শিল্প ও স্থাপত্যের বিকাশের কাল। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ার জাভা এবং মিয়ানমারের প্যাগান স্থাপত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই সময়েই 'পাল শিল্পরীতি'র বিকাশ ঘটে, যা সূক্ষ্ম পাথর এবং ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যের জন্য আজ বিশ্ববিখ্যাত।

ময়নামতি ও দেবপর্বত

যখন উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় পালদের শাসন চলত, তখন দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় (সাত শতক থেকে বারো শতক) কয়েকটি স্বাধীন রাজবংশের শাসন ছিল। এর মধ্যে খড়্গ, দেব, চন্দ্র এবং বর্মণ রাজবংশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলটি ছিল এই রাজবংশগুলোর প্রধান কেন্দ্র, যা প্রাচীনকালে 'দেবপর্বত' নামে পরিচিত ছিল।

ময়নামতি অঞ্চলে ৫০টিরও বেশি বৌদ্ধ মঠ ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। শালবন বিহার, আনন্দ বিহার এবং কোটিলা মুড়া তৎকালীন শিক্ষা ও ধর্মচর্চার বিশাল কেন্দ্র ছিল। এখানে প্রাপ্ত চার শতাধিক স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সমতট ও হরিকেল অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত গতিশীল। বিশেষ করে শ্রীচন্দ্র (Chandra Dynasty) এই অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করেন এবং কামরূপ (আসাম) পর্যন্ত ক্ষমতা বিস্তার করেন।

বৈদিক সংস্কৃতির পুনরুত্থান ও সামাজিক পরিবর্তন(সেন রাজবংশ)

একাদশ শতকের শেষে পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজবংশ বাংলার ক্ষমতা দখল করে । বিজয় সেন এই রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত । সেন শাসনামল বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে এক ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। পালদের আমল যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা পেত, সেন আমলে সেখানে গোঁড়া হিন্দু বা বৈদিক ধর্মের পুনরুত্থান ঘটে ।

রাজা বল্লাল সেন বাংলায় 'কুলীন প্রথা' প্রবর্তন করেন, যা সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং বর্ণ প্রথাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সেন আমলের রাজা লক্ষণ সেন ছিলেন বিদ্যোৎসাহী এবং তাঁর রাজসভায় জয়দেব, ধোয়ী ও হলায়ুধের মতো বিখ্যাত পণ্ডিতগণ অবস্থান করতেন। তবে এই সময়েই তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের মাধ্যমে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে সেন শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

নিচে সেন আমলের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

প্রশাসনিক স্তর বিবরণ ও গুরুত্ব

ভুক্তি (Bhukti) সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক একক বা প্রদেশ (যেমন: পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি) ।

বিষয় (Vishaya) ভুক্তির উপবিভাগ বা বর্তমানের জেলার মতো একক ।

মন্ডল (Mandala) বিষয়ের ক্ষুদ্রতর বিভাগ বা মহকুমা ।

চতুরাক ও পাটক সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট।

প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি, বাণিজ্য ও মসলিনের আদি ঐতিহ্য

প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি কেবল কৃষিনির্ভর ছিল না, বরং শিল্প ও বাণিজ্যেও এটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। তৎকালীন বিশ্বের দরবারে বাংলার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল এর সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্র - 'মসলিন'। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকেই 'পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি' গ্রন্থে বাংলার মসলিন রপ্তানির বিবরণ পাওয়া যায়।

বাংলার মসলিন এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে একে 'শবনম' (সন্ধ্যার শিশির) বা 'আব-ই-রাওয়ান' (প্রবহমান জল) নামে ডাকা হতো। ঢাকার সোনারগাঁও অঞ্চল ছিল এই শিল্পের মূল কেন্দ্র। এছাড়া চাল, নীল, চিনি এবং রেশম ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য। তাম্রলিপ্ত এবং চট্টগ্রামের সমুদ্র বন্দরগুলো ব্যবহার করে বাংলার বণিকরা শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমনকি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত যাতায়াত করত।

ভাষা ও সংস্কৃতির বিবর্তন

বাংলা ভাষার ইতিহাস মূলত মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে বিবর্তনের ইতিহাস। ষষ্ঠ থেকে দশম শতকের মধ্যে প্রাচীন প্রাকৃত ভাষা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষার আদি রূপ লাভ করে। দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত 'চর্যাপদ' হলো বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন।

এই ভাষার বিকাশে পাল আমলের বৌদ্ধ ধর্মীয় চর্চা এবং লোকজ সংস্কৃতির বড় অবদান ছিল। যদিও সেন আমলে সংস্কৃতের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, কিন্তু চর্যাপদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভাষা হিসেবে বাংলা তার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।

তৎকালীন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় 'বাংলাদেশ' নামক বর্তমান রাষ্ট্রটির যে রূপ আমরা দেখি, তার আদি বীজ রোপিত হয়েছিল সেই হাজার বছর আগেই। নদীপথের বাণিজ্য, মসলিনের কারিগরি আর চর্যাপদের সেই মরমী সুর আজও আমাদের জাতিগত পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলার এক অমূল্য পাঠশালা। প্রাচীন বাংলার এই ঋদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের মাধ্যমেই আমরা আমাদের শেকড়কে শক্তিশালী করতে পারি এবং বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারি।

(এই গবেষণা নিবন্ধটি প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন একাডেমিক সোর্স এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।).

সূত্র

  1. .
    নিজস্ব প্রতিবেদনপূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন