সর্বশেষ
প্রচ্ছদে ফিরুন

ডিপ স্টেট কী এবং কেন এটি বিতর্কিত?

ডিপ স্টেট বা 'রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র' আধুনিক রাজনীতির এক অমীমাংসিত রহস্য। কীভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং স্থায়ী আমলাতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনা করে?

রাজনীতি|১৬ ফেব, ২০২৬, ১৮:১০|পড়ার সময়: ১১ মিনিট|Zarrar Hyder
ডিপ স্টেট কী এবং কেন এটি বিতর্কিত?

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল এবং বহুমাত্রিক ধারণা হলো 'ডিপ স্টেট' (Deep State) বা 'গভীর রাষ্ট্র'। এটি মূলত এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নামমাত্র শাসক হিসেবে থাকেন, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার নাটাই থাকে পর্দার আড়ালে থাকা কিছু অনির্বাচিত এবং শক্তিশালী গোষ্ঠীর হাতে । এই গোষ্ঠীগুলো মূলত সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, স্থায়ী আমলাতন্ত্র এবং কখনও কখনও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক বা মাফিয়া চক্রের সমন্বয়ে গঠিত হয় । ডিপ স্টেট ধারণাটি কেবল কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রগুলোতেও এর অস্তিত্ব এবং প্রভাব নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে।

ডিপ স্টেট শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় এটি তুর্কি শব্দ 'দেরিন দেভলেত' (Derin Devlet)-এর সরাসরি অনুবাদ বা ক্যাল্ক (Calque) । তুরস্কে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অগণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপ শুরু করে, তখন এই শব্দটি বিশ্বরাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে । তবে এর মূল চেতনা বা ছায়া শক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস আধুনিক রাষ্ট্রের উৎপত্তির সমান্তরাল। অনেক গবেষক একে 'রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র' (State within a State) বা 'ছায়া সরকার' (Shadow Government) হিসেবেও অভিহিত করেন।

এই ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো এর স্থায়িত্ব এবং পেশাদারিত্ব। নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় আসেন এবং চলে যান, কিন্তু ডিপ স্টেটের সদস্যরা স্থায়ী আমলাতন্ত্রের অংশ হওয়ায় তারা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে । তাদের এই ক্ষমতার উৎস কেবল আইন নয়, বরং অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের জাল, গোয়েন্দা তথ্য এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ । যখনই কোনো নির্বাচিত সরকার এই স্থায়ী কাঠামোর স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সংস্কার বা পদক্ষেপ নিতে চায়, তখনই ডিপ স্টেট নীরব বা সরব প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ঐতিহাসিক উৎস এবং তুরস্কের 'দেরিন দেভলেত'

ডিপ স্টেট ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক জন্মভূমি হিসেবে তুরস্ককে বিবেচনা করা হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের সূচনালগ্ন থেকেই সেখানে একটি শক্তিশালী সামরিক-আমলাতান্ত্রিক বলয় গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রধান অভিভাবক মনে করত । তাদের বিশ্বাস ছিল যে, নির্বাচিত রাজনীতিকরা যদি রাষ্ট্রের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করার নৈতিক অধিকার দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তুরস্কে এই গোপন নেটওয়ার্কের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে প্রতিষ্ঠিত 'স্পেশাল অর্গানাইজেশন' (Teşkilât-ı Mahsusa) নামক একটি আধা-সামরিক গোপন সংস্থা আধুনিক তুর্কি ডিপ স্টেটের আদি রূপ বলে মনে করা হয় । এই সংস্থাটি রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেও স্বাধীনভাবে কাজ করত এবং আর্মেনীয় গণহত্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে এদের ভূমিকা ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন । স্নায়ুযুদ্ধের সময় বামপন্থী আদর্শের বিস্তার ঠেকাতে 'কাউন্টার-গেরিলা' (Counter-Guerrilla) নামক একটি গোপন কাঠামোর মাধ্যমে এই ডিপ স্টেট আরও শক্তিশালী হয়, যা মূলত ন্যাটোর 'অপারেশন গ্লাডিও'-এর অংশ ছিল।

তুরস্কের এই ছায়া শক্তির অস্তিত্ব ১৯ শতকের শেষ দিকেও অনুভূত হয়েছিল, কিন্তু এটি জনসমক্ষে আসার জন্য ১৯৯৬ সালের সুসুরলুক কেলেঙ্কারি (Susurluk Scandal) একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে । ৩ নভেম্বর ১৯৯৬ সালে সুসুরলুকের কাছে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর দেখা যায় যে, একই গাড়িতে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং একজন আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ান্টেড অপরাধী ও খুনি (আবদুল্লাহ চাতলি) ছিলেন 。 এই দুর্ঘটনাটি প্রমাণ করে দেয় যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী, অপরাধ জগত এবং রাজনীতিকদের মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গোপন সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, যারা রাষ্ট্রের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করত।

আর্নস্ট ফ্রাঙ্কেল এবং দ্বৈত রাষ্ট্রের ধারণা

ডিপ স্টেটের কার্যপ্রণালী বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর্নস্ট ফ্রাঙ্কেল (Ernst Fraenkel)-এর 'দ্বৈত রাষ্ট্র' (Dual State) তত্ত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ১৯৪১ সালে প্রকাশিত তার বইতে ফ্রাঙ্কেল নাৎসি জার্মানির শাসন ব্যবস্থাকে দুটি সমান্তরাল অংশে বিভক্ত করেছিলেন। ফ্রাঙ্কেল মূলত একজন ইহুদি শ্রম আইনজীবী ছিলেন, যিনি নাৎসি জার্মানির পতনের আগ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছিলেন ।

ফ্রাঙ্কেলের মতে, দ্বৈত রাষ্ট্রের প্রথম অংশ হলো 'নরম্যাটিভ স্টেট' (Normative State)। এটি রাষ্ট্রের সেই অংশ যা প্রচলিত আইন, চুক্তি এবং প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী চলে । এটি মূলত সাধারণ নাগরিক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখে যাতে অর্থনীতি সচল থাকে। অন্যদিকে রয়েছে 'প্রেরোগেটিভ স্টেট' (Prerogative State), যা কোনো আইন বা সংবিধানের তোয়াক্কা করে না । এই প্রেরোগেটিভ স্টেট বা ডিপ স্টেট মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে যেকোনো সময় নরম্যাটিভ স্টেটের আইনকে অগ্রাহ্য করতে পারে। ফ্রাঙ্কেল লক্ষ্য করেন যে, নাৎসি জার্মানির গেস্টাপো (Gestapo) এবং এসএস (SS) বাহিনী এই প্রেরোগেটিভ স্টেটের প্রতিনিধি হিসেবে বিচারহীনভাবে সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত ।

এই তত্ত্বের আধুনিক প্রয়োগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আমেরিকার নিয়মিত আদালত এবং সংসদীয় ব্যবস্থা হলো তাদের নরম্যাটিভ স্টেট, কিন্তু সিআইএ (CIA), এনএসএ (NSA) এবং পেন্টাগনের গোপন অপারেশনগুলো হলো তাদের প্রেরোগেটিভ বা ডিপ স্টেট কাঠামো । ফ্রাঙ্কেলের এই অন্তর্দৃষ্টি আমাদের শেখায় যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের পাশাপাশি কীভাবে একটি আইনবহির্ভূত ক্ষমতা কাঠামো টিকে থাকতে পারে।

মাইকেল গ্লেনন এবং মার্কিন 'ডাবল গভর্নমেন্ট' তত্ত্ব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিপ স্টেট বা ছায়া রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে, তা বিশ্লেষণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর হলো মাইকেল গ্লেনন (Michael Glennon)-এর 'ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ডাবল গভর্নমেন্ট' । গ্লেনন মূলত তুফ্টস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এবং কংগ্রেসের ফরেন রিলেশনস কমিটির সাবেক কাউন্সেল । তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেই হোন না কেন—সে ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামা হোক বা রিপাবলিকান জর্জ বুশ—জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক দিকগুলো প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।

বিজ্ঞাপন

গ্লেনন এই ধারাবাহিকতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য 'ডাবল গভর্নমেন্ট' বা দ্বৈত সরকারের ধারণা দেন, যা মূলত ১৯ শতকের ব্রিটিশ লেখক ওয়াল্টার বেজহটের তত্ত্বের আধুনিক রূপান্তর । গ্লেননের মতে, আমেরিকার শাসন ব্যবস্থা দুটি অংশে বিভক্ত:

১. ম্যাডিসোনিয়ান প্রতিষ্ঠান (Madisonian Institutions): এর মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস, প্রেসিডেন্ট এবং বিচার বিভাগ। এগুলো জনগণের সামনে একটি দৃশ্যমান গণতন্ত্র বজায় রাখে এবং মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে তারা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে ।

২. ট্রুম্যানাইট নেটওয়ার্ক (Trumanite Network): এটিই হলো আসল ডিপ স্টেট, যা শত শত সিনিয়র সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত । এই নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বয়ংক্রিয়। গ্লেনন সতর্ক করেন যে, এই ট্রুম্যানাইট নেটওয়ার্কটি কোনো নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি যা নিজস্ব স্বার্থ ও ক্ষমতা রক্ষায় অভ্যস্ত এবং যারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকেও অনেক সময় তাদের সিদ্ধান্তের কাছে জিম্মি করে ফেলে।

গ্লেননের মতে, নির্বাচিত কর্মকর্তারা জাতীয় নিরাপত্তা বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের মতো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, তাই তারা পুরোপুরিভাবে ট্রুম্যানাইট নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের লাগাম থাকে অনির্বাচিত আমলাদের হাতেই।

গভীর রাজনীতি (Deep Politics) এবং পিটার ডেল স্কট

ডিপ স্টেট আলোচনার ক্ষেত্রে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর পিটার ডেল স্কট (Peter Dale Scott) একটি অগ্রণী নাম। তিনি 'ডিপ পলিটিক্স' বা গভীর রাজনীতি শব্দটি প্রবর্তন করেন । স্কটের মতে, গভীর রাজনীতি হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সংবিধান বহির্ভূত কিছু শক্তি এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির ব্যবসায়িক স্বার্থ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে ।

স্কটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিপ স্টেট কেবল সরকারি আমলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূলত তিনটি স্তরের একটি সংমিশ্রণ:

নিরাপত্তা রাষ্ট্র: গোয়েন্দা এবং সামরিক বাহিনী ।

ওভারওয়ার্ল্ড (Overworld): বিশাল ধনী পুঁজিপতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ।

আন্ডারওয়ার্ল্ড (Underworld): সংগঠিত অপরাধ চক্র বা মাফিয়া ।

পিটার ডেল স্কট জেএফকে (JFK) হত্যাকাণ্ড বা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির মতো ঘটনাগুলোকে গভীর রাজনীতির ফসল হিসেবে দেখেন। তার মতে, যখনই কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই গভীর কাঠামোর স্বার্থে আঘাত হানতে চান, তখনই এই গোপন নেটওয়ার্কগুলো তাদের সরিয়ে দেওয়ার বা নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা করে । তার এই তত্ত্বটি পরবর্তীতে অ্যারন গুড (Aaron Good)-এর মতো গবেষকরা আরও বিস্তারিত করেছেন, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি 'ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র' হিসেবে বর্ণনা করেন যেখানে সাম্রাজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ডিপ স্টেট সবসময় সক্রিয় থাকে।

মিশরীয় ডিপ স্টেট ও এর সামরিক-ব্যবসায়িক আধিপত্য

মিশরের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেট ধারণাটি কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি দেশটির যাপিত জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। ১৯৫২ সালের বিপ্লবের পর থেকে মিশরের সামরিক বাহিনী একটি বিশাল এবং জটিল ক্ষমতার জাল বিস্তার করেছে, যা দেশটির প্রতিটি কোণে প্রোথিত । মিশরের ডিপ স্টেট মূলত সামরিক বাহিনী (SCAF), গোয়েন্দা সংস্থা (Mukhabarat), পুলিশ এবং মুবারক আমলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গঠিত ।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় যখন হোসনি মুবারকের পতন ঘটে, তখন বিশ্ব ভেবেছিল মিশরে গণতন্ত্র ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, ডিপ স্টেট কেবল তার অগ্রভাগের মুখ পরিবর্তন করেছে । ২০১২ সালে যখন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন মিশরের ডিপ স্টেট তার প্রতিটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালের অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে মিশরে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি করা হয়েছিল বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, যা মুরসি সরকারকে অজনপ্রিয় করার জন্য ডিপ স্টেটের একটি কৌশল ছিল । ২০১৩ সালের ৩ জুলাই যখন জেনারেল সিসি ক্ষমতা দখল করেন, তখন সেই দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলো রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে পুরো বিশৃঙ্খলাটি ছিল ডিপ স্টেটের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা।

মিশরের ডিপ স্টেটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। মিশরের সামরিক বাহিনী সরাসরিভাবে পাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে হোটেল ব্যবসা এবং রিয়েল এস্টেট খাত নিয়ন্ত্রণ করে। এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাদের নির্বাচিত সরকারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে সাহায্য করে।

পাকিস্তানের 'এস্টাবলিশমেন্ট' এবং আইএসআই-এর ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপ স্টেটের সবচাইতে শক্তিশালী এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখা যায় পাকিস্তানে। সেখানে একে সাধারণভাবে 'এস্টাবলিশমেন্ট' (The Establishment) বলা হয় । ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি মূলত একটি 'সিকিউরিটি স্টেট' বা নিরাপত্তা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে সামরিক বাহিনীই চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস।

পাকিস্তানের ডিপ স্টেটের মূল স্তম্ভগুলো হলো:

সামরিক নেতৃত্ব: উচ্চপদস্থ জেনারেলদের কাউন্সিল।

আইএসআই (ISI): দেশটির শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা, যারা রাজনৈতিক দল গঠন বা ভাঙা এবং নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য পরিচিত।

অর্থনৈতিক কাঠামো: 'ফৌজি ফাউন্ডেশন' বা 'আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট'-এর মতো বিশাল শিল্পগোষ্ঠী, যা সামরিক বাহিনীকে স্বাবলম্বী করে তোলে ।

বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্র: যারা দীর্ঘকাল ধরে সামরিক শাসনের আইনি বৈধতা দিয়ে এসেছে।

পাকিস্তানের ডিপ স্টেট মূলত ভারত এবং আফগানিস্তান বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতি এবং পরমাণু অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ন্ত্রণ করে। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীরা যখনই এই ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, তখনই তারা হয় কারাবন্দী হয়েছেন অথবা নির্বাসনে গেছেন । জেনারেল জিয়া-উল-হকের আমলে এই ডিপ স্টেট কাঠামোতে উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ যুক্ত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের সমাজ এবং রাজনীতিতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে 'ডিপ স্টেট' শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে । বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়কে কেন্দ্র করে এমন একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, যা একটি আদর্শ ডিপ স্টেটের মতো কাজ করত ।

ব্রুম্যান ইনস্টিটিউট ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর 'The Deep State and the Prospects for Reform in Bangladesh' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের তিনটি প্রধান দিক চিহ্নিত করা হয়েছে :

১. প্রাতিষ্ঠানিক কব্জা (Institutional Capture): রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন পুলিশ, র‍্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা এবং এমনকি বিচার বিভাগকে সুপরিকল্পিতভাবে দলীয় অনুগত করা হয়েছে। এর ফলে আইন ও ন্যায়বিচার কেবল ডিপ স্টেটের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে।

২. ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (Crony Capitalism): রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, যারা ব্যাংক লুটের মাধ্যমে সম্পদ পাচার করত এবং ডিপ স্টেটকে অর্থায়ন করত।

৩. আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে থাকা পূর্ববর্তী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত বা অনুগত কর্মকর্তারা নীরব অসহযোগিতা বা প্রতিরোধের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা একটি 'সাইলেন্ট রেজিস্ট্যান্স' হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশে এই ডিপ স্টেট কাঠামো এতটাই গভীর যে, কেবল ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন এনে একে নির্মূল করা সম্ভব নয়। BIGD রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী, আমলাতন্ত্রে মেধাতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীন করা এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ওপর জনগণের স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হলো এখান থেকে উত্তরণের প্রধান পথ।

ডিপ স্টেটের কার্যপ্রণালী এবং মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি কি হতে পারে?

ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে আমাদের এর কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। এটি কোনো সাধারণ ষড়যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

১. জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই (Securitization):

ডিপ স্টেটের অন্যতম বড় অস্ত্র হলো 'জাতীয় নিরাপত্তা' (National Security)। তারা সবসময় জনগণের মনে একটি কাল্পনিক শত্রু বা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখে। এটি হতে পারে কমিউনিজম (তুরস্ক বা আমেরিকার ক্ষেত্রে), সন্ত্রাসবাদ (৯/১১ পরবর্তী সময়ে) বা কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভয় (পাকিস্তানের ক্ষেত্রে) । এই ভয়ের দোহাই দিয়ে তারা রাষ্ট্রের বাজেট এবং গোপনীয়তার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

২. ল-ফেয়ার (Lawfare) বা বিচারিক আক্রমণ:

ডিপ স্টেট সবসময় আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করার চেষ্টা করে, তবে সেই আইনগুলো তারা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে। একে বলা হয় 'জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম' বা 'ল-ফেয়ার'। যেমন ফ্রাঙ্কেলের নাৎসি জার্মানি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আদালতগুলোই নীতিনির্ধারণ করেছিল যে ইহুদিদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া যাবে না, যদিও সাধারণ আইন তা সমর্থন করত না । বর্তমানেও বিভিন্ন দেশে দুর্নীতি বা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ব্যবহার করে জনপ্রিয় নেতাদের ডিপ স্টেট কর্তৃক কোণঠাসা করার ঘটনা নিয়মিত দেখা যায়।

৩. কর্পোরেট এবং মিডিয়া নেটওয়ার্ক:

মাইক লোফগ্রেন (Mike Lofgren) তার 'The Deep State: The Fall of the Constitution and the Rise of a Shadow Government' বইতে দেখিয়েছেন যে, আমেরিকার ডিপ স্টেট কেবল সরকারি দপ্তরে নেই, বরং এটি ওয়াল স্ট্রিট (Wall Street) এবং সিলিকন ভ্যালি (Silicon Valley)-র সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । বিশাল কর্পোরেট ডোনেশন এবং মিডিয়া প্রচারণার মাধ্যমে তারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট বা নেতা নির্বাচনে ভূমিকা রাখে, যিনি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবেন।

ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি ডিপ স্টেট এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন । হারারির মতে, মানুষ সবসময় ক্ষমতার পেছনে কোনো এক অদৃশ্য হাত বা ষড়যন্ত্র খুঁজতে পছন্দ করে। মধ্যযুগে যেমন 'ডাইনি' বা শয়তানের উপাসকদের একটি গোপন নেটওয়ার্ক সমাজ ধ্বংস করছে বলে আতঙ্ক ছড়ানো হতো, আধুনিক যুগে 'কিউঅ্যানন' (QAnon) বা ডিপ স্টেট সংক্রান্ত কিছু কট্টর তত্ত্বে একই রকম মানসিকতা দেখা যায়।

হারারি সতর্ক করেন যে, সব ডিপ স্টেট আলোচনা ষড়যন্ত্র নয়, তবে যখন দাবি করা হয় যে একটি গোপন গোষ্ঠী মানুষের রক্ত পান করছে বা শয়তানের আরাধনা করছে (যেমন কিউঅ্যানন দাবি করে), তখন তা সুস্থ রাজনৈতিক আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করে । প্রকৃত ডিপ স্টেট হলো প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং অনির্বাচিত আমলাতন্ত্রের প্রভাব, যা কোনো 'কালো জাদু' নয় বরং একটি প্রশাসনিক সংকট।

যখন সার্বভৌমত্ব জনগণের হাত থেকে ফস্কে অনির্বাচিত আমলা বা সামরিক জেনারেলদের হাতে চলে যায়, তখন সেই রাষ্ট্রটি তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে । আর্নস্ট ফ্রাঙ্কেল থেকে মাইকেল গ্লেনন পর্যন্ত সকল বিশেষজ্ঞের একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, এই অদৃশ্য ছায়া শক্তির সবচাইতে বড় শত্রু হলো 'স্বচ্ছতা' এবং 'জবাবদিহিতা'।

[এই গবেষণা প্রতিবেদনে তুর্কি 'দেরিন দেভলেত', জার্মান 'দ্বৈত রাষ্ট্র' এবং মার্কিন 'ডাবল গভর্নমেন্ট' তত্ত্বে ১০০টিরও বেশি উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ডিপ স্টেটের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।]

সূত্র

  1. .
    নিজস্ব প্রতিবেদনপূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন

ছায়া মন্ত্রিসভা কী? কেন এটি একটি আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। এর ইতিহাস ও কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে এই প্রতিবেদনে।

পোস্টাল ভোট কী ও কীভাবে কাজ করে?

সশরীরে ভোটকেন্দ্রে না গিয়েও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা হলো পোস্টাল ভোট। এই নির্বাচনি পদ্ধতির কারিগরি দিক, ভোট সুরক্ষা এবং ব্যালট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল কবে? যা জানাল নির্বাচন কমিশন | বাংলাদেশ নির্বাচন

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচন কমিশন কখন ফলাফল ঘোষণা করবে এবং ফল প্রকাশের ডিজিটাল পদ্ধতি কী হবে তা জানুন বিস্তারিত।

প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন? ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

প্রথমবারের ভোটারদের জন্য ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই নতুন ও অনিশ্চিত মনে হতে পারে। এই প্রতিবেদনে ভোটার স্লিপ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া, পরিচয় যাচাই, ব্যালট গ্রহণ, গোপন কক্ষে সিল দেওয়া এবং ব্যালট বাক্সে জমা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।