জুলাই সনদে কী আছে? গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতলে বাংলাদেশ কীভাবে বদলাবে?
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার দলিল, যা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণয়ন করে। এতে ৮৪টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' জারি করে বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে যাচ্ছে। গণভোটটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠিত হবে, যাতে 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোটে সনদের সমর্থন নিশ্চিত করা হবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই সনদ প্রণয়ন করে। ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করে, যাতে সংবিধান, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার আনা হবে। এবারের গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতলে এগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে, 'না' হলে বাতিল।
জুলাই সনদের ৮৪টি পয়েন্টে আসলে কী আছে। “হ্যাঁ”—
১। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে এবং সকল মাতৃভাষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে।
২। বাঙালি ও আদিবাসী নির্বিশেষে সকল নাগরিক কেবল “বাংলাদেশি” নামে পরিচিত হবেন।
৩। সংবিধান সংশোধনের জন্য সুপারমেজরিটি এবং মৌলিক ধারার ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক হবে।
৪। সংবিধান সংশোধনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিতকারী ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হবে।
৫। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলসহ অন্তর্বর্তী বিধানসমূহ বাতিল করা হবে।
৬। জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করা হবে এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
৭। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ পরিবর্তিত হয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় সম্প্রীতি।
৮। বাংলাদেশকে বহুজাতিক, বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
৯। মৌলিক অধিকারসমূহ সম্প্রসারিত, সুরক্ষিত ও কার্যকর করা হবে।
১০। রাষ্ট্রপতি সংসদের উভয় কক্ষের গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন।
১১। রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানদের স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেবেন।
১২। রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের জন্য একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হবে।
১৩। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষমতা আইনগত নীতিমালার আওতায় প্রয়োগ করা হবে।
১৪। কোনো ব্যক্তি মোট দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
১৫। প্রধানমন্ত্রী একযোগে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান হতে পারবেন না।
১৬। সংবিধানসম্মত ও বিস্তারিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হবে।
১৭। বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
১৮। উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ১০০ সদস্য থাকবে।
১৯। উচ্চকক্ষ আইন পর্যালোচনা করবে, তবে স্থায়ী ভেটো ক্ষমতা থাকবে না।
২০। উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা নিম্নকক্ষের সমমানের হবে।
২১। সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রতি নির্বাচনে ন্যূনতম ৫% করে বৃদ্ধি করে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে। তবে এটি পুরোপুরি কোটা নয়; দলীয় মনোনয়নে নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে কোটা কেবল একটি অস্থায়ী সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে থাকবে।
২২। রাজনৈতিক দলসমূহ ধাপে ধাপে কমপক্ষে ৩৩% নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে।
২৩। সংসদের উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে মনোনীত হবেন।
২৪। সংসদের গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দল পাবে।
২৫। অর্থ বিল ও অনাস্থা ভোট ছাড়া সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন।
২৬। জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষ হবে।
২৭। প্রতি আদমশুমারি বা সর্বোচ্চ দশ বছর পর সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
২৮। প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে নিয়োগ পাবেন।
২৯। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারক প্রধান বিচারপতি হবেন।
৩০। প্রয়োজন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
৩১। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য বিচারিক নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে।
৩২। বিচারিক নিয়োগ কমিশন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
৩৩। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা সংবিধানে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হবে।
৩৪। সার্কিট বেঞ্চের পরিবর্তে বিভাগীয় স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৩৫। বিচারকদের শৃঙ্খলা ও অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করা হবে।
৩৬। অধস্তন আদালতের বিচারকদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হবে।
৩৭। স্থায়ী রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তা (গভর্নমেন্ট অ্যাটর্নি) সার্ভিস গঠন করা হবে।
৩৮। নির্বাচন কমিশনাররা স্বচ্ছ ও বহুদলীয় প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাবেন।
৩৯। সংবিধান অনুযায়ী একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া হবে।
৪০। তিনটি স্বাধীন সরকারি কর্ম কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৪১। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাবেন।
৪২। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা হবে।
৪৩। ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে।
৪৪। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
৪৫। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ পূর্ণ আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে।
৪৬। স্থানীয়ভাবে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
৪৭। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা পাবে।
৪৮। সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণে পৃথক আইন প্রণয়ন করা হবে।
৪৯। সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণে তাৎক্ষণিক সংস্কার গ্রহণ করা হবে।
৫০। বিচারকদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
৫১। অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রবর্তন করা হবে।
৫২। সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন প্রশাসনিক সচিবালয় গঠন করা হবে।
৫৩। একটি স্বাধীন ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৫৪। মামলার জট কমাতে বিচারক সংখ্যা ও বিশেষ আদালত বৃদ্ধি করা হবে।
৫৫। জাতীয় আইন সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হবে।
৫৬। বিচারক ও আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে।
৫৭। আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন করা হবে।
৫৮। মধ্যস্থতা ও সালিশ সংক্রান্ত আইন আধুনিকায়ন করা হবে।
৫৯। আইনজীবীদের আচরণবিধি আধুনিক ও রাজনীতিমুক্ত করা হবে।
৬০। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সংগঠন বার নির্বাচনে নিষিদ্ধ হবে।
৬১। বিচারকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে গণ্য হবে।
৬২। তথ্য অধিকার আইন শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করা হবে।
৬৩। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট সংশোধন করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হবে।
৬৪। গণহত্যা ও নির্বাচনী জালিয়াতি তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
৬৫। স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৬৬। সাধারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পৃথক সরকারি কর্ম কমিশন থাকবে।
৬৭। নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ পৃথক করা হবে।
৬৮। কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হবে।
৬৯। একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৭০। অবৈধ আয়কে বৈধ করার যেকোনো আইনগত প্রথা নিষিদ্ধ করা হবে।
৭১। স্বার্থের সংঘাত রোধে পৃথক আইন প্রণয়ন করা হবে।
৭২। প্রকৃত মালিকানা নিবন্ধনের মাধ্যমে অর্থপাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করা হবে।
৭৩। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অর্থায়ন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করা হবে।
৭৪। জনপ্রতিনিধিদের বার্ষিক সম্পদ ও আয় বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে।
৭৫। রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মনোনয়ন বা পদায়ন করবে না।
৭৬। দুর্নীতি দমন কমিশনারদের যোগ্যতার পরিধি সম্প্রসারণ করা হবে।
৭৭। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে।
৭৮। দুর্নীতি মামলায় পূর্বানুমতির বিধান বাতিল করা হবে।
৭৯। কর গোপনীয়তা আইন দুর্নীতি তদন্তে বাধা হতে পারবে না।
৮০। বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
৮১। আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস গ্রহণ করা হবে।
৮২। জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কৌশল প্রণয়ন করা হবে।
৮৩। সকল সরকারি সেবা সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা হবে।
৮৪। বাংলাদেশ ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেবে।
গণভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সনদের পূর্ণাঙ্গ খসড়া পড়ুন এবং নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই করুন। 'হ্যাঁ' মানে সংস্কারের পথ খোলা, 'না' মানে বর্তমান ব্যবস্থাই বহাল থাকবে।
সূত্র
- ১.নিজস্ব প্রতিবেদন — পূর্ববঙ্গ ম্যাগাজিন
আরও পড়ুন
ডিপ স্টেট কী এবং কেন এটি বিতর্কিত?
ডিপ স্টেট বা 'রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র' আধুনিক রাজনীতির এক অমীমাংসিত রহস্য। কীভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং স্থায়ী আমলাতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনা করে?
ছায়া মন্ত্রিসভা কী? কেন এটি একটি আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। এর ইতিহাস ও কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে এই প্রতিবেদনে।
পোস্টাল ভোট কী ও কীভাবে কাজ করে?
সশরীরে ভোটকেন্দ্রে না গিয়েও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা হলো পোস্টাল ভোট। এই নির্বাচনি পদ্ধতির কারিগরি দিক, ভোট সুরক্ষা এবং ব্যালট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল কবে? যা জানাল নির্বাচন কমিশন | বাংলাদেশ নির্বাচন
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচন কমিশন কখন ফলাফল ঘোষণা করবে এবং ফল প্রকাশের ডিজিটাল পদ্ধতি কী হবে তা জানুন বিস্তারিত।
